মঙ্গলবার, ১৭-জুলাই ২০১৮, ০২:০৯ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে, ডলার সংকট প্রকট হচ্ছে: মূল কারণ ব্যাপকহারে অর্থ পাচার

বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে, ডলার সংকট প্রকট হচ্ছে: মূল কারণ ব্যাপকহারে অর্থ পাচার

sheershanews24.com

প্রকাশ : ১১ মে, ২০১৮ ০৭:৫৭ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্য : নির্বাচনের বছরে দেশে অর্থ সংকট প্রকট হচ্ছে। একদিকে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট নিয়ন্ত্রণে আসছে না। উচ্চ হারে সুদ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও এখন আর আমানত পাচ্ছে না বেসরকারি ব্যাংকগুলো। অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং রফতানি আয় কমে যাবার কারণে বাণিজ্য ঘাটতি অস্বাভাবিকহারে বেড়ে গেছে। এতে ডলার সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ব্যাপকভাবে অর্থ পাচারের কারণেই এমনটি হচ্ছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমানে ব্যাংকগুলোর উপর সাধারণ আমানতকারীদের কোনো আস্থা নেই। তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংক- সময় মতো আমানতকারীর টাকা ফেরত দিতে পারছে না। আর যে হারে সুদ দেয়ার কথা বলে ব্যাংক টাকা নেয়, পরে তা দেয় না। বরং ব্যাংকের ১০ শতাংশ উদ্যোক্তা লুটপাট করে ব্যাংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এতে গত মার্চে গণহারে ব্যাংকগুলো থেকে আমানত তুলে নিয়েছেন গ্রাহকরা। এতে বেসরকারি ব্যাংকের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। অপরদিকে সরকারি ব্যাংকেও একই অবস্থা।
সূত্র বলছে, নির্বাচনের বছরে আওয়ামী ঘরানার বড় ব্যবসায়ী, ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও আমলারা নামে-বেনামে বিদেশে অর্থ পাচারে উঠে-পড়ে লেগেছেন। অনেকে এরই মধ্যে কানাডা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও বৃটেনে ‘সেকেন্ড হোম’ও তৈরি করে ফেলেছেন। কেউ আবার সুবিধা মতো বিদেশে অর্থ পাচার করে প্রয়োজনে দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়ে রাখছেন বলেও নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এতে দেশের ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকটের পাশাপাশি ডলারের জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে। গত বছর এপ্রিল মাসে ৭৯ টাকায় ডলার পাওয়া যেত, অথচ এখন ৮৭ টাকা পর্যন্ত ডলার বিক্রি হচ্ছে। তাও আবার সময় মতো প্রয়োজনীয় পরিমাণ পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ আছে ব্যবসায়ীদের। সূত্রমতে, অর্থ পাচারে ব্যাংকগুলোও জড়িয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা পাচাকারীদের সহযোগিতা করছেন বলেও জানা যাচ্ছে। হুন্ডির মাধ্যমে যেমন পুরোনো পদ্ধতিতে অর্থ পাচার হচ্ছে, সেই সাথে নতুন বেশ কিছু পদ্ধতিও যোগ হয়েছে। এর মধ্যে, এলসি দিয়েও পণ্য আমদানি না করে টাকা পাচার। আমদানিকৃত পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে অর্থ পাচার হচ্ছে। আবার পণ্য রফতানি করেও দেশে অর্থ ফেরত না এনে বিদেশে রেখে দিয়ে কিংবা রফতানি পণ্যের দাম কম দেখিয়েও অর্থ পাচারের অভিযোগ আছে। এদিকে দেশে আমদানি-রফতানিতে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে। এর পেছনেও অর্থ পাচারকেই অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, রমজানের আগে বিভিন্ন ধরনের ভোগ্যপণ্যের আমদানি আরও বাড়বে। তখন আমদানি-রফতানির ভারসাম্যহীনতা আরও বাড়বে। ডলারের সংকট আরও প্রকট হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হলে রমজানে ভোগ্য পণ্যের দাম অনেক বেড়ে যাবে। যা সামগ্রিকভাবে বাজার পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করবে বলেও বিশ্লেষকদের ধারণা।
সূত্র বলছে, শুধু রমজানকে ঘিরেই আতঙ্ক নয়, নতুন জাতীয় নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে অর্থ সংকট ততই প্রকট হচ্ছে। পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকে এ নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। সরকারও বেশ অস্বস্তিতে আছে অর্থ পাচার ও তারল্য সংকট নিয়ে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ এখনই সচেষ্ট না হলে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে দেশের উন্নয়ন ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে বিশাল ঘাটতি
বাংলাদেশের ইতিহাসে আমদানি-রফতানি লেনদেন ভারসাম্যে বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এত বড় ঘাটতি আগে কখনো হয়নি। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে ৩ হাজার ৫৮২ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। একই সময়ে পণ্য রফতানি থেকে আয় হয়েছে ২ হাজার ৪০৮ কোটি  ৯০ লাখ ডলার। এ হিসাবে পণ্য বাণিজ্যে সার্বিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১৭৩ কোটি ২০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরে যা ৬০৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার ছিল। পণ্য বাণিজ্যের পাশাপাশি সেবা বাণিজ্যেও ঘাটতি বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে সেবা বাণিজ্যে মোট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৯৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ২১১ কোটি ৭০ লাখ ডলার। সেবা খাতের বাণিজ্যে মূলত বিমা, ভ্রমণ ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আমদানি ব্যয় ও রফতানি আয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। গত মার্চ মাসে রফতানিতে নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০১৭ সালের মার্চ মাসের তুলনায় এ বছরের মার্চে রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাইনাস এক দশমিক ৩৮ শতাংশ। আবার, একই সময়ে রেকর্ড পরিমাণ আমদানি করতে হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৩৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, অস্বাভাবিকভাবে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া ও রফতানি আয় কমে যাওয়ার কারণে দেশকে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে হবে। তিনি বলেন, ‘এখনই এই চাপ সহ্য করতে হচ্ছে। আগামীতে এই চাপ আরও বাড়বে। যেহেতু রফতানিতে নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি; অথচ আমদানি ব্যয় ৩৩ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। এর ফলে ক্রমেই বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে।’ আহসান এইচ মনসুরের মতে, আমদানি ব্যয় মেটাতে যে পরিমাণ টাকা লাগবে, সেই টাকা থাকলে সমস্যা হবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতদিন এভাবে চলবে। এই অর্থবছরেই বড় ধরনের টানাপড়েনে থাকতে হবে সরকারকে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী অর্থ বছরে টানাপড়েন আরও বাড়বে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আমদানি ব্যয় ছিল ৫০১ কোটি ৯১ লাখ ডলার। যদিও ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমদানি ব্যয় ছিল ৩৭৬ কোটি ৯ লাখ ডলার। এই হিসাবে গত বছরের ফেব্রুয়ারির তুলনায় এ বছরের একই সময়ে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১২৬ কোটি ডলার। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে রফতানি আয় হয়েছে ৩০৫ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। যদিও ২০১৭ সালের মার্চে রফতানি আয় হয়েছিল ৩০৯ কোটি ৭৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার। এই হিসাবে গত বছরের মার্চের তুলনায় এই বছরের মার্চে রফতানি আয় কমেছে ৪ কোটি ২৮ লাখ ডলার। অবশ্য রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসের হিসাবে রফতানি প্রবৃদ্ধি নেগেটিভ হলেও এ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপারেল ফেডারেশনের (আইএএফ) বোর্ড মেম্বার ও তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সাবেক সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘সার্বিকভাবে রফতানি কমেনি; বিদেশের বাজারে তৈরি পোশাকের দাম কমে যাওয়ায় রফতানি আয় কম এসেছে। অবশ্য নির্বাচনের বছরে অসাধু অনেকেই রফতানি আয় দেশে নাও আনতে পারেন। এ কারণেও রফতানি আয় কমছে।’ পিআরআই’র নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুরের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যই বলে দিচ্ছে আমদানি ও রফতানি এই দুই প্রক্রিয়াতেই টাকা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এই বছরই নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশ থেকে টাকা বাইরে চলে যাচ্ছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা উচিত। দেশে বড় বড় যেসব প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে সেগুলোর পেছনে আমদানি ব্যয় হলে দোষের কিছু নেই। কিন্তু আমদানির নামে টাকা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে কিনা সেটাও দেখার বিষয়। আবার রফতানিও বাড়ছে না। এর পেছনে কোনও রহস্য আছে কিনা তাও বের করা জরুরি।’ পিআরআই’র এই গবেষক মনে করেন, এমনও হতে পারে, কেউ কেউ রফতানি করছেন। কিন্তু রফতানি আয়ের টাকা দেশে আনছেন না। মানে অর্থ পাচার করছেন। তিনি বলেন, ‘যদি অর্থ পাচার না হয়ে থাকে, তাহলেও বিপদে আছি ধরে নিতে হবে। বিষয়টি সরকারকে গভীরভাবে ভাবতে হবে।’ তিনি বলেন, এখন ব্যাংকগুলোতে ৬০ শতাংশের বেশি এলসি খোলা হয়েছে। অর্থাৎ আগামী দিনগুলোতেও আমদানি বাড়তেই থাকবে। এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাবে। এর ফলে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম আরও বাড়বে। এ প্রসঙ্গে এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি ও তৈরি পোশাক রফতানিকারদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, ‘মাসের হিসাবে রফতানি আয় কমলেও বছরের হিসাবে রফতানি আয় বাড়ছে।’ তবে বিদেশে পোশাকের দাম কমে যাওয়ার কারণে মার্চ মাসের রফতানি আয় কম হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি এই আট মাসে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৭১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৬৭ কোটি ২৪ লাখ ডলার। অর্থাৎ এই আট মাসে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ২৬ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সাথে এ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৩ হাজার ২০ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় তা ৬০ দশমিক ৭১ শতাংশ বেশি।
এদিকে, আমদানি ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে বেসামাল হয়ে পড়েছে ব্যাংকগুলো। তারল্য সংকটের কারণে এলসির দায় পরিশোধ করতে পারছে না বেশ কয়েকটি ব্যাংক। জানা গেছে, এ অর্থবছরের শুরু থেকেই খাদ্যশস্যসহ মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির বিপুলসংখ্যক এলসি খোলা হয়েছে। সেই তুলনায় রেমিটেন্স ও রফতানি আয় না বাড়ায় ব্যাংকগুলোতে ডলারের সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদা মেটাতে প্রতিদিনই ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ অর্থবছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে ছেড়েছে ১৮০ কোটি ডলারের বেশি। এর পরও থামছে না টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল আন্তঃব্যাংক লেনদেনে প্রতি ডলারের দাম ছিল ৭৯ টাকা ৭০ পয়সা। এ বছরের একই দিন ৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছে ৮২ টাকা ৯৮ পয়সায়। অবশ্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বলছে, অধিকাংশ ব্যাংকই ঘোষিত মূল্যের বেশি দামে ডলার বিক্রি করছে। চলতি বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের শেষ দুই কর্মদিবসে প্রায় সব ব্যাংকই ৮৪ থেকে ৮৬ টাকায় ডলার বিক্রি করেছে। আর খোলাবাজারে (কার্ব মার্কেট) ৮৭ টাকার বেশি দামেও ডলার বিক্রি হয়েছে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে চলতি হিসাবেও ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) দেশের চলতি হিসাবে ৬৩১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যদিও ২০১৫-১৬ অর্থবছরের চলতি হিসাবে ৪২৬ কোটি ২০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল।
অপরদিকে, এই অর্থবছরের সাত মাসেই (জুলাই-জানুয়ারি) পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১২ কোটি ৩০ লাখ (১০ দশমিক ১২ বিলিয়ন) ডলার। এই অংক গত অর্থবছরের পুরো সময়ের চেয়েও প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বেশি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশ ৩১ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এই সময়ে বিভিন্ন দেশে পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ২১ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার। এই হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ১০ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার।
যেভাবে অর্থ পাচার হচ্ছে
চলতি বছরের জানুয়ারিতে অবৈধ লেনদেন ও মুদ্রা পাচারের মামলায় সাতজন মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টকে গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গত ৩ জানুয়ারি রাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। সিআইডি বলছে, রেমিটেন্সের অর্থ অবৈধভাবে বিকাশের মাধ্যমে হুন্ডি করার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে আটটি মামলা রয়েছে। তারা কোটি টাকার উপরে লেনদেন করেছে বলে পুলিশ বলছে। দুইদিন আগে একই অভিযোগে আরো দুজন বিকাশ এজেন্টকে গ্রেফতার করে সিআইডি। বিকাশ এবং মোবাইল ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ২ হাজার ৮৮৬ জন এজেন্টের অস্বাভাবিক লেনদেন তদন্ত করার জন্য সিআইডিকে অনুরোধ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই তদন্তের সূত্রেই এই আটজন এজেন্টকে গ্রেফতার করা হয়। বিকাশের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য বা অন্য অনেক দেশে অনেক মানি এক্সচেঞ্জ বা অর্থ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান তাদের দোকানে বিকাশ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখে। সেখানে থাকা বাংলাদেশি অভিবাসীরা মনে করে, এটাই বিকাশের শাখা। তাই তারা সেখানে দেশে সহজে টাকা পাঠানোর জন্য যান। সেখানে তারা দেশে থাকা কোন স্বজনের ফোন নম্বর দেন, যে নম্বরে এই টাকা গ্রহণ করা হবে।’ তিনি বলেছেন, ‘এরপর এসব প্রতিষ্ঠান দেশে থাকা তাদের কোনও এজেন্টকে ওই নম্বরে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বিকাশ করার জন্য বলে দেন। সেই স্বজন হয়তো তখন তার মোবাইলের মাধ্যমেই টাকা পান। কিন্তু এক্ষেত্রে বিকাশ বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নাম ব্যবহার করা হলেও আসলে হুন্ডির মাধ্যমে টাকার লেনদেন হচ্ছে।’
সিআইডি যে ব্যক্তিদের গ্রেফতার করেছে, তারাও স্বীকার করেছে, প্রবাস থেকে আসা অর্থ তারা এভাবে বিকাশ ব্যবহার করে লেনদেন করেছেন। সিআইডির জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার শারমিন জাহান বলছেন, বিকাশের মতো মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে বিদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে এই ব্যক্তিরা।
আরও যেসব কারণ
বিশ্লেষকরা বলছেন, সংকট প্রকট হওয়ার আরও কিছু কারণ আছে। এর মধ্যে প্রথমত হচ্ছে, প্রবাসীদের রেমিটেন্স আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিদেশি বিনিয়োগ অনেক কমে গেছে। ফলে এর প্রভাব পড়েছে ব্যাংকগুলোতে।
রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার পেছনে বেশ ক’টি কারণও তুলে ধরেছেন অর্থনীতিবিদরা। ১. মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভালো নেই। হাজার হাজার প্রবাসীকে গত কয়েক বছরে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। অনেক প্রবাসী অবৈধ হয়ে পড়ায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ধরা পড়লে তাদেরকেও জেলে পোরা হবে বা দেশে পাঠানো হবে। এমনকি লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে গিয়ে নানাভাবে হয়রানি, জেল বা নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন কেউ কেউ। এতে রেমিটেন্স আয় কমেছে। ২. দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হওয়ায় ও নানা ধরনের রাজনৈতিক হয়রানির কারণে অনেকে বিদেশে গিয়ে দেশে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন। যার প্রভাব পরেছে রেমিটেন্সের ওপর। ৩. নানা কারণে অনেকে বিদেশেই স্থায়ীভাবে থাকার ব্যবস্থা করেছেন। একজন বিদেশে যাওয়ার পর পরিবারের অন্য সদস্যরাও বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
নজর দিতে হবে যেদিকে
চলতি হিসাব ভারসাম্যে ঘাটতি নিয়ে এখনই বিচলিত হওয়ার মত কিছু না দেখলেও আমদানির আড়ালে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে (পণ্যের বেশি মূল্য দেখিয়ে) টাকা পাচার হচ্ছে কিনা- সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, “এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে, যাতে কোনো অবস্থাতেই কোনো আমদানিকারক দাম বেশি দেখিয়ে পণ্য আমদানি করতে না পারে বা এক পণ্যের নামে অন্য পণ্য বা খালি কনটেইন্টার না আসে।”
ঠিক রফতানির ক্ষেত্রে এর উল্টোটা হতে পারে। অর্থাৎ আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে (পণ্যের কম মূল্য দেখিয়ে) টাকা পাচারের সুযোগ রয়েছে। রফতানিকারকরা আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে কিংবা রফতানি পণ্যের অর্থ দেশে ফেরত না এনে অর্থ পাচার করছে কিনা- তাও বাংলাদেশ ব্যাংককে খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
(সাপ্তাহকি শীর্ষকাগজে ৭ মে ২০১৮ প্রকাশতি)